আজ রবিবার, ০৭ মার্চ ২০২১, ০৩:১১ অপরাহ্


মিষ্টি ভুল

দুপুর গড়িয়ে বিকেল আনতে যাচ্ছে সূর্য। তখনই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম মেয়েটিকে পিছনে নিয়ে পশ্চিম দিকে যাচ্ছে রনি। ভাবলাম রনির গার্লফ্রেন্ড। মেয়েটির মুখে হাসি দেখলাম। রনিকেও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে দেখলাম। স্মার্ট হয়ে গাড়ির ড্রাইভিং করছে। তার শালী নেই। একটু সামনে রনিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে পা বাড়ালাম। আরেকজন পরিচিত মানুষ কে দেখতে পেলাম। তার কাছ থেকে জানলাম রনির শালী নেই। তাই মামাতো শালিকে নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে।

রনির বউ দুই সন্তানকে নিয়ে খুব বেকাদায়। শীতের মৌসুমে ঠান্ডা কবলিত অসুস্থতায় দুই সন্তানকে ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারছেন না। বেচারা কি আর করবে। মাকে সুপারিশ ধরেই মামাতো বোনটাকে বাড়িতে নিয়ে কটা দিন রাখতে চায়। মামাতো বোন তাও রাজী হয়ে গেল। শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে। আরো মোটরসাইকেলে বসে।

মুহুর্তেই নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছে। মানুষকে দেখেই ভুলভাবে মন্তব্য করা, ভুল ভাবে ভাবতে থাকা আসলে ঠিক না। ভাগ্যিস আমি কারো সাথে মন্তব্যটা শেয়ার করার আগেই আমার ভুলটা ভেঙে দিলেন ওই মানুষটি।

কর্মঠ ছেলে রনি। ছোটবেলা থেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করছেন। অসুস্থ মা বাবাকে নিয়ে রীতিমত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন রনি। কখনো ডাক্তারের কাছে। কখনো মা বাবাকে ওষুধ খাবার দাবারের খোঁজ খবর নেয়া খুব কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। একদিকে নিজের ভবিষ্যৎ। দুই সন্তান, স্ত্রীকে নিয়ে বেকাদায়। অন্যদিকে বৃদ্ধ মা-বাবার যত্ন নেয়া। রনি একজন কৌতুহলী মানুষ।
রনিকে নিয়ে আমার না, আরো এরকম অনেক ভুল ধারণা ছিল।
কর্মজীবনে রনি যেখানে সবসময় বসে দায়িত্ব পালন করেন, তার পাশে কিনা খুব সুন্দরী নার্স নামের কয়েকজন মেয়েকে দেখতাম। প্রথম দুদিন তো আমি দেখে ভেবেছিলাম রনির ওয়াইফ। কিন্তু না একদিন হোটেলেই পরিচয় হলো রনির ওয়াইফ ও দুই সন্তানের।
কাছের মানুষ আর কাছে আসার মানুষ এভাবেই ভুল ভাঙতে ভাঙতে হৃদয় কেড়ে নেয়। এমনই একজন রনি। আমার মন কেড়ে নিয়েছে। আজও বলতে পারিনি আমি তোমাকে ভালোবাসি। যতবারই বলতে গিয়েছি, ততবারই ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে আর এই ধারণায় মর্মাহত হয়েছি। তার সাথে আমার জীবন সংসার হলো না।
যতবার কাছে গিয়ে ভালোবাসি বলতে চেয়েছি। ততবারি ভুল প্রেক্ষাপট এসে আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
রনিকে নিয়ে আমার ভুল ধারণার শেষ নেই! কিছুদিন পূর্বে প্রেমারা নাটকের অভিনয় করতে গিয়ে একটি দৃশ্য দেখে আমি অভিভূত হলাম।
সেখানে রনিকে দেখেছি। রনি পুলিশ ইন্সপেক্টরের চরিত্রে অভিনয় করছে। কতবার ভেবেছি রনির পাশে বসে যাতায়াত করব। সে আমাকে কোনো সুযোগই দিল না। রনি আমার মুখোমুখি বসার জন্য সামনে গিয়ে বসলো। মুখোমুখি কথা চলতে থাকলো। সেখানে রনি বললÑ দেহের সৌন্দর্য কে পছন্দ করেন না। মনের সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। সত্যিই আমি কেমন সেটা তো আমি বলতে পারব না। আমার সব, আমার সৌন্দর্য, আমার ভালোবাসা, আমার হৃদয়- সবি অন্য জনে ভালবাসবে। বলাবলি করবে। রনি আমাকে নিয়ে কখনো কুরুচিপূর্ণ কথা বলেনি।
যেদিন হোটেলে বসে রনির দুই সন্তান ও স্ত্রীকে দেখে পরিচিত হলাম, সেদিন সত্যিই আমার ভিতর সব দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। যেভাবে মহাসড়কে শত শত প্রাণ চলে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি আমার মনটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। শত শত হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি প্রাণের মত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল প্রতিটি নিঃশ্বাস।
কর্মব্যস্ততায় রনির সাথে দেখা হয়নি অনেক বছর। কিন্তু মনের প্রেম মুছতে পারিনি।
পুরনো নীড়ে ফিরে এসে দেখি রনির সুখী সংসার। রনির বন্ধু সিরাজ মুন্সী। তার সাথে আমার বেশ সখ্যতা। সিরাজ মুন্সীর সমাজের আনাচে কানাচের খবর রাখেন বেশি। একদিন সিরাজ মুন্সী খবর পেল তার গ্রামের এক গৃহিণীর ব্যবহার খারাপ। স্বামীকে পাত্তাই দেয় না। সুযোগ পেলে গ্রামের যুবকদের নিয়ে তামাশা করে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে গৃহিণীর চারপাশে যুবকদের কানাঘুষা দেখা যায়। সিরাজ মুন্সী ইচ্ছে করেই হাতেনাতে ধরতে তার ঘরের পাশে গিয়ে হাজির। সিরাজ মুন্সী জানতো না তার পিছনে আরেকজন ঘুরপাক খাচ্ছে। সিরাজ মুন্সীর কম দামের মোবাইলটা জ্বালিয়ে ঘরের জানালা দিয়ে আলো দিল। দেখল ভিতরে এক যুবক। ভিতরের যুবক বলল- ‘কেরে কেরে।’ আর বাইরের যুবক বলল- ‘চোর চোর, ধর ধর।’ সিরাজ মুন্সীর কষ্টের টাকায় কেনা জুতাগুলো ফেলে ঘোড়া দৌড় শুরু করলো। পিছনে তাকানোর সময় নেই। সিরাজ মুন্সীর দীর্ঘশ্বাস আর নিরাপদে যাওয়ার পালা। ওরা ধরতে পারল না, দেখতেও পেল না। ভাগ্যের কি পরিহাস সমাজকে বদলাতে গিয়ে নিজেই বিপাকে পড়ে গেলেন। সিরাজ মুন্সী আজও নিজেকে সে গল্প বলতে বলতে কন্ঠে কাঁপন ধরে যায়। ওই যুবকদের ভুল ভাঙ্গা হয়ে উঠল না সিরাজ মুন্সীর। পার পেয়ে গেল ওই খারাপ ব্যবহারের গৃহিণী।
এই সিরাজ মুন্সীর আরও এমন ভুল ধারণার গল্প শুনলাম। সিরাজ মুন্সী বহু গুণে গুণান্বিত। গানের দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে সিরাজ মুন্সী নায়িকার হাত ধরে ফেললেন। সেই দৃশ্য দেখে সিরাজ মুন্সীর বৌ কড়া শাসন করে দিলেন। শাসন করে বললেন, আর কখনো যেন অভিনয় না করেন। দেহের সৌন্দর্যের চেয়ে মনের সৌন্দর্য অনেক বড় সিরাজ মুন্সী তার একটা উদাহরণ। বউ যতই শাসন করেন না কেন, মন কি আর মানে। অভিনয় করতে এখনও দ্বিমত পোষণ করেন না।
ভুল ধারণা। ভুল বুঝা। সন্দেহ করা। এমনটাই সমাজে সচারাচর চলছে। রনির শিক্ষাজীবনের শিক্ষক জলিল মাস্টার। তিনি খুব উদারতা মানবিকতার সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন। কর্মের টানে ফেনীর মহিপাল সড়ক দিয়ে মোটর সাইকেল চালিয়ে আসতে লাগলেন। ভাঙ্গাচোরা রাস্তার যুগ ছিল তখন। কোথাও অবরোধ কোথাও হরতাল। থমথমে সড়কের বেপরোয়া দৃশ্য। চৌকস জলিল মাস্টার কখনো ৪০ কখনো ৬০ গিয়ারে মোটর সাইকেল চালিয়ে আসছেন। সামনে কাপড় পেঁচানো এক নারীকে দেখতে পেলেন। সড়কে শুয়ে রয়েছেন। দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না কি ষোড়শী না পঞ্চাশোর্ধ। মানবতার দৃষ্টিতে তাকে তুলে উঠানোর চেষ্টা করলেন। ওই নারীকে দেখে একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন জলিল মাস্টার। তাকে ভাবতে ভাবতেই পূর্ব দিক থেকে বাংলা ছায়াছবির খলনায়ক মঞ্জুর রাহির মত পা বাড়িয়ে তেড়ে আসলেন দুই সন্ত্রাসী। মিনিট দেড়েক সময় নিয়ে ওই সন্ত্রাসীদের মার্শালাট শিখিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত ফিরলেন। সন্ত্রাসীদের পাতানো ফাঁদে একজন মাস্টারের মানবতা বিলীন হয়ে গেল। ভুল ভাঙলো জলিল মাস্টারের। সন্ত্রাসীরা ইচ্ছে করেই কিশোরীকে দিয়ে সড়কে ফাঁদ পেতে পথচারিদের অপদস্থ ও লুটতরাজ করতে চেয়েছিলো। রনিও জলিল মাস্টারের মত মানবতা প্রেমী। রনির সাথে সংসার করতে পারিনি। তাতে দুঃখ নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রনিকে দেখে ভালোবাসার অনুভূতি পাই।
বসন্তের গান শুনতে গিয়ে একটি কলি মনে ধরেছে। ওই গানে শিল্পী মনের মাধুরী দিয়ে সেখানে বলেছেন- দুঃখটাই নাকি সবচেয়ে বেশি দামি। রনির জীবনও তাই। হাসিমাখা মুখের মধ্যে অনেক দুঃখ। প্রতিদিন ভাবে তার কাছে এই দুঃখ গুলোই অনেক দামি। আমার কাছেও রনি অনেক দামি।
রনির হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব বয়সে আজগর আলী। তিনিও ভুল করে দুই বার হোঁচট খেয়েছেন। একবার তার মোবাইলে ভুল করে ৫০ টাকা রিচার্জ করে দেন এক কলেজ ছাত্রী। বেচারী কলেজ ছাত্রী আজগর আলী কে ফোন করে বললেন ‘টাকাটা ফেরত দিয়েন চাচা।’ ডিজিটাল যুগের কলেজ ছাত্রী আর পুরনো যুগের আজগর আলী। আজগার আলী বললেন, ‘আমি তো টাকাটা মোবাইলে আর পাঠাতে পারবো না, টাকাটা নিতে হলে আমার হাত থেকে নিতে হবে। আমি তোমার কলেজের সামনে আসব, তুমি আমার হাত থেকে টাকা নিয়ে যেও।’ আজগর আলী ফরেজগার মানুষ। কথা দিয়ে কথা রাখলেন। ওই টাকাটা ফেরত দিলেন। ভুল করলো কলেজ ছাত্রী আর কষ্ট করে কলেজ গেইটে যেতে হলো আজগর আলীকে। অবশ্যই কলেজ ছাত্রী একটি চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
আজগর আলীর এমন আরেকটি ঘটনা আছে। তিনি ক্লান্ত হয়ে একদিন দুপুরে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফিরে তার কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম নিতে প্রস্তুতি নিলেন। কম্বল গায়ে কে জানি শুয়ে আছে। নিজের বিছানায় নিজের মানুষ ছাড়া কেউ কি আর থাকতে পারে! মনে মনে আনন্দ নিয়ে কৌতুহলী হয়ে খাটের উপর গিয়ে কম্বলের ভেতর ঢুকে গেলেন। জড়িয়েও ধরলেন। হায় হায় আজগর আলীর বৃদ্ধ বউয়ের এত শক্তি। মুহূর্তে মধ্যেই ছটফট করে উঠে দৌঁড় মারলেন। পিছনে তাকিয়ে দেখলেন বউ না, এক কিশোরী। বেচারা আজগর আলী হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন। কি হয়ে গেল। এই বয়সে এমন ভুল।

আসলে আজগর আলী নিজের থেকে ভুলটি করেনি। পরে পুত্রবধূ এসে বলল ওই কিশোরী রাগ করে দোতলা থেকে তিনতলায় আমাদের বাসায় এসে লুকিয়ে ছিল। আর তারপরে আজগর আলীর শুনতে হলো নিজের আপন মানুষের বকাঝকা।

মানুষের ভুলগুলো অনেক বেদনা দায়ক। এই ভুলগুলো কখনো কখনো সমাজে মিষ্টিতে রূপান্তরিত হয়। ভুলের মানুষ কুলে আসা জুটে না সবার। তাই আমারও রনিকে পাওয়া হল না। রনির সাথে আমার এভাবে দেখা হোক। তবে আর কখনো ভুল মন্তব্য, ভুল ভাবনা আমাকে যেন মর্মাহত না করে। আমিও আজ অন্যের ঘরণী। সময় সুযোগ পেলে রনি কে সব বলবো। অন্তত, মনের কষ্ট-দুঃখ-বেদনা আর ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা থাকবে।

লেখক পরিচিতিঃ-
মনিরুজ্জামান বাবলু
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
মোবাইল-০১৮১৬ ০৬৩০৪১