আজ মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন


সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় তীব্র শ্রমিক সংকটে কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি::

সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় ধান কাটার শ্রমিক সংকটে কৃষক। কৃষি বিভাগ অন্যান্য সময়ের মতো এবারও কিছু এলাকায় ধান কাটার মেশিনের ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সংকট সরকারের একার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয় এজন্য এলাকার বড়ো বড়ো কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি ভালো মানের ধান কাটার মেশিন কিনতে পারেন। এতে তারা নিজেরা যেমন উপকৃত হবে পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি কৃষকরাও উপকৃত হবেন।

জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের কৃষক সিদ্দেক মিয়া বলেন, অখনই ধান কাডনের মানুষ পাওয়া যায় না বৈশাখ মাসে কি অইবো। গেলবারও ৫০০ টাকা রোজ কামলা ধইরা ধান কাটাইছি এইবার কি করুম এভাবেই ধান কাটার শ্রমিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন।
একই গ্রামের হোসেন আলী বলেন, আগে চৈত মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেপারী ভাগালুরা হাওর এলাকায় আইতো। গেল ১০/১২ বৎসর যাবৎ কোন হাওরে বিদেশী ভাগালু পাওয়া যায় না। মধ্যনগর থানার শালদিঘা গ্রামের কৃষক অরিবিন্দু বলেন, হাওরে বজ্রপাত ধান কাটার শ্রমিক সংকটের অন্যতম কারণ এছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় বালি পাথর কোয়ারিতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজ করে এজন্য হাওরে ধান কাটার লোকের অভাব হয়। তাহিরপুর উপজেলার মধ্য তাহিরপুর গ্রামের জুবেল মিয়া বলেন, অখন মাত্র হাওরে ধান কাটা শুরু অইছে। সপ্তাহ খানেক পরে পুরোপুরি ধান কাটা শুরু অইবো। তখন গিরস্থের অবস্থা কি অইবো।

এব্যাপারে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউপি চেয়ারম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন বলেন, প্রতি বছর এ সময় ধান কাটার শ্রমিক সংকট সৃষ্টি হয়। কৃষক চড়াদাম দিয়ে রোজিনা কামলা মাধ্যমে জমির ধান কাটান। এ অবস্থা দূর করতে হলে প্রতিটি গ্রামের ধান কাটার মেশিন দেয়া প্রয়োজন।

এব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, সকল হাওরে একযোগে ধান কাটা শুরু হওয়ার কারণে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এজন্য কৃষি অফিসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে গেলবারের মতো এবছরও মজুরী দিয়ে জমির ধান কাটতে হবে কৃষকদের। এজন্য ধান কাটার মেশিন আরও সহজলভ্য করা উচিৎ।

হাওরে মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী জেলা সদর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়ারা বাজার, ধর্মপাশা, ছাতক সহ ১১ টি উপজেলায় শাল্লার হাওর, কালনার হাওর, করচার হাওর, হালির হাওর, আঙ্গুরালী হাওর, পুটিয়ার হাওর, তাহিরপুর হালির হাওর, মহালিয়ার হাওর, গুরমার হাওর, শনির হাওর, মাতিয়ান হাওর, চন্দ্র সোনার থাল হাওর, সোনা মোড়ল হাওর, ধানকুনিয়া হাওর, জয়ধূনা হাওর, ঘোড়া ডুবার হাওর, কাইলানী হাওর, পাগনার হাওর, মিনি পাগনার হাওর, জোয়াল ভাঙ্গা হাওর, জামখলা হাওর, খাই হাওর, ডেকার হাওর, কাচিভাঙ্গা হাওর, সাংহাই হাওর, কাওয়াজুরী হাওর, নাইন্দায়ার হাওর, চাউলির হাওর, কালনার হাওর, নলুয়ার হাওর, সুরাইয়া বিবিয়ানা হাওর, কালিয়া কোটা, ছায়ার হাওর, বরাম হাওর, উদগল বিল হাওর, চাপতির হাওর, হুরামন্দিরা হাওর, টাংনির হাওর, ভান্ডাবিল হাওর, শাল্লার ভেড়াডহর হাওরসহ ছোট বড়ো ৯৫টি হাওর রয়েছে। এসব হাওরের ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। আবাদকৃত জমি গুলোতে এখন কাঁচা আধা পাকা ও পাকা ধান রয়েছে। আর কয়েকদিন পর জেলার সবকটি হাওরে একযুগে বোরো ধান কাটে ঘরে তোলার মওসুম শুরু হবে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে এখনো অনেক কৃষক দিশেহারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানাযায়, সারা জেলায় হাইব্রীড, উফশি ও স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। সদর উপজেলায় ১৬ হাজার ১৫০ হেক্টর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২২ হাজার ৪৭৫ হেক্টর, দোয়ারা বাজার উপজেলায় ১৩ হাজার ১০০ হেক্টর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ১১ হাজার ৪৯০ হেক্টর, জগন্নাথপুর উপজেলায় ২০ হাজার ৭২৫ হেক্টর, জামালগঞ্জ উপজেলায় ২৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর, তাহিরপুর উপজেলায় ১৮ হাজার ৩০০ হেক্টর, ধর্মপাশা উপজেলায় ৩১ হাজার ৮০০ হেক্টর, ছাতক উপজেলায় ১৪ হাজার ৮০০ হেক্টর, দিরাই উপজেলায় ২৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর ও শাল্লা উপজেলায় ২২ হাজার ১০ হেক্টর, মোট ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোঃ বশির আহমদ সরকার বলেন, বোরো মওসুমে সব হাওরে একযোগে ধান কাটা শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। কৃষি বিভাগ অন্যান্য সময়ের মতো এবারও কিছু এলাকায় ধান কাটার মেশিনের ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সংকট সরকারের একার পক্ষ্যে দূর করা সম্ভব নয় এজন্য এলাকার বড়ো বড়ো কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি ভালো মানের ধান কাটার মেশিন কিনতে পারেন। এতে তারা নিজেরা যেমন উপকৃত হবে পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি কৃষকরাও উপকৃত হবেন।##