আজ রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন


সুনামগঞ্জে বাস লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে চালকসহ নিহত ৭ জন

বিশেষ প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের এই গার্মেন্ট কর্মীদের ১০-১২ জনের দলটি শনিবার রাতে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জগামী বাসে ওঠেছিল। হতদরিদ্র পরিবারের শিক্ষা সংগ্রামী শাল্লা ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ক্ষিতেশ দাস গার্মেন্টসে কাজ করে পড়ার খরচ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঈদের ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন গার্মেন্টকর্মী সাগর মিয়া, আফজাল হোসেন, মিলন আহমেদসহ কয়েকজন।
রোববার(২জুন) ভোরে ঢাকা-সুনামগঞ্জগামী বাস থেকে মদনপুর পয়েন্টে নেমে যাত্রা শুরু করেন লেগুনাযোগে গন্তব্যের দিকে। বাড়ির কাছাকাছি এসে গণিগঞ্জে বাস লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান লেগুনা গাড়ির চালকসহ ৭ জন। আহত হন আরো ৫ জন। এ ঘটনায় হতদরিদ্র পরিবারে শোকের মাতম চলছে। পরিবারে ফেরার আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে তাদের।

নিহতরা হলেন- দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের দুর্বাকান্দা গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে আফজাল হোসেন (১৬), একই গ্রামের ফয়জুল মিয়ার ছেলে মিলন (১৫), ইস্তফা মিয়ার ছেলে সাগর মিয়া (১৬), একই উপজেলার গাগলী গ্রামের আলী আকবরের ছেলে লেগুনা চালক মো. নোমান (২২), শাল্লা উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের মনীন্দ্র কুমার দাসের ছেলে রিমেশ চন্দ্র দাস (২২), দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের সেচনি গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে ফজলুল করিম (৩০) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কুটি গ্রামের নারায়ন চন্দ্র সাহার ছেলে শিপন কুমার সাহা (৩৩)।

 

গুরুতর আহতরা হলেন- দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দুর্বাকান্দা-ঠাকুর-ভোগ গ্রামের ফজল মিয়ার ছেলে রেজাউল করিম (১৬), শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের রাধাকৃষ্ণ দাসের ছেলে শংকর দাস (২১), তার ন্ত্রী তারামণি দাস (১৮), দিরাই উপজেলার মকসদুপুর গ্রামের মহরম আলীর ছেলে আবুল কাশেম (২৪), একই উপজেলার ভাটিপাড়া এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে রাজু মিয়া (২০), রাজানগর ইউনিয়নের গচিয়া গ্রামের ইমান আলীর ছেলে কাজল মিয়া (৩০)।

 

স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় নিহতদের লাশ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ।
জানাযায়,শাল্লা উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের ক্ষিতেশ চন্দ্র দাস (২৫) শাল্লা সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এই শিক্ষাসংগ্রামী হতদরিদ্র পরিবারের তরুণ পড়ালেখার খরচ জোগাতে ঢাকায় গার্মেন্টে যান চাকরি করতে। শনিবার রাতে বাড়ি আসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। ভোরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের মদনপুর পয়েন্টে এসে দিরাইগামী একটি লেগুনায় অন্যযাত্রীদের সঙ্গে ওঠেন তিনি। গাড়িতে ওঠার প্রায় ২০ মিনিট পড়েই দুর্ঘটনার মুখে পড়ে তাদের বহনকারী লেগুনাটি। দিরাই থেকে ঢাকাকামী লিমন পরিবহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে তাদের বহনকারী লেগুনাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ছিটকে পড়ের সড়কের পূর্বে। লিমন পরিবহনটিও সংঘর্ষে উল্টে গিয়ে সড়কের পশ্চিমে খাদে পতিত হন। তবে ক্ষিতেশসহ লেগুনা যাত্রীরাই মারা যান। পালিয়ে যায় লিমন পরিবহনের ড্রাইভার হেল্পারসহ সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে দুর্ঘটনায় ছেলে সাগরের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দুর্বাকান্দা গ্রামের হতদরিদ্র নারী দিলারা বেগম। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই সাগর মা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। মায়ের জন্য নিয়ে এসেছিল ঈদের নতুন শাড়ি। ছেলের স্মৃতিচারণ করে বিলাপ করছিলেন মা। এক পর্যায়ে তিনি গাছের সঙ্গে মাথা ঠেস দিয়ে আরো করুণ সুরে বিলাপ করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি মূর্ছা গেলে স্বজনরা তাকে নিয়ে চলে যান। এভাবে নিহতদের স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের বিলাপ থামাতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদেরও চোখ বেয়ে জল নামে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানাযায়, লিমন পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৫-০৮০১) ঢাকা থেকে দিরাইয়ে যাত্রী নামিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে আসছিল। বাসটি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার গণিগঞ্জ এলাকায় পৌঁছলে দিরাই-মদনপুর পয়েন্ট থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী লেগুনা (সিলেট-ছ-২৫৯১) এর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় যাত্রীবাহী বাস ও লেগুনাটি সড়কের দুপাশে ছিটকে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলে ৬ লেগুনা যাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হন আরো ৮ যাত্রী।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস এসে লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ লাশের পরিচয় সনাক্ত করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।

 

প্রত্যক্ষদর্শী গণিগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ও কৃষক তাজির উদ্দিন বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার জন্য লিমন পরিবহনের বাসের চালকই দায়ী। কারণ বাসের চালক খুব বেপরোয়া গতিতে বাসটি চালাচ্ছিল। আমাদের ধারনা সারারাত বাস চালানোর কারণে এই চালক ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। কারণ লিমন বাসের চালক কিছু সময় আগে দিরাইয়ে যাত্রী নিয়ে গিয়েছিল। যাত্রী নামিয়ে বাস চালকের বিশ্রাম বা ঘুমানোর কথা ছিল। কিন্তু এই চালক যাত্রী নামিয়ে না ঘুমিয়ে আবারো বাসটি নিয়ে দ্রুত গতিতে সুনামগঞ্জ যাচ্ছিল।’

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬ জনের লাশ সদর হাসপাতালে আনা হয়েছিল। আহত ৮ জনকে সদর হাসপাতালে এসেছিলেন। এদের ৫ জনকে গুরুতর অবস্থায় সিলেট পাঠানো হয়েছিল, একজন রাস্তায় মারা গেছেন।

 

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, বাস-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে লেগুনার ৫ জন যাত্রী ও লেগুনাচালক ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত আরো একজন মারা গেছেন। লেগুনার ৭ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।