আজ মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ১০:১১ অপরাহ্


রাজনীতিতে খিচুড়ি পাকানো

গ্রামের ছেলে, গ্রামে জন্ম, গ্রামে বড় হয়ে ওঠা, মূল লেখাপড়াও গ্রামেই। এমন গ্রাম যেখানে বছরের ৫ মাস (আষাঢ়-কার্তিক) বর্ষায় রাস্তাঘাট সব পানির নিচে ডুবে থাকত। অনেক কষ্টে আমাদের কাদামাটি প্যাক মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হতো। বেশি বর্ষায় কয়েকজন মিলে নৌকা বা কোন্দায় (তাল গাছের গোড়া দিয়ে বানানো জলযান) করে যেতে হতো। এর কোন বিকল্প ছিল না। কিছু কাঁচা রাস্তা ছিল সেগুলো বর্ষায় ডুবে থাকত। পানি শুকাতে শুরু করলে রাস্তায় কাদামাটি মাড়িয়ে যেতাম। রাস্তার মাঝে সাঁকো থাকত না বেশিরভাগ সময়। সাঁকো মানে তো একটা বাঁশ দিয়ে বানানো। আমাদের অঞ্চল থেকে আমরা ৩০/৩২ জন চান্দ্রা স্কুল-মাদ্রাসায় যেতাম। বইখাতা, শার্ট লুঙ্গিতে বেঁধে হাফপ্যান্ট পরে খাল সাঁতরে পার হতাম। প্যান্টটি বাজারে এক দোকানের পেছনে শুকোতে দিয়ে ক্লাসে যেতাম। সেইসব স্মৃতি আজও নদীর ওপর সূর্য কিরণের মতো জ্বলজ্বল করছে।

অভাব-অনটন সেকালেও ছিল। বরং আরও বেশি ছিল। গরিব বাড়ির মহিলারা অবস্থাসম্পন্ন বাড়ি থেকে ফ্যান নেবার জন্য ঘুরে বেড়াতে আমরাও দেখেছি। কোন কোন বাড়ির গৃহবধূরা ফ্যানের সঙ্গে ভাত-তরকারিও দিয়ে দিত। তখন মানুষের প্রতি মানুষের মমতা ছিল। দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল সম্পন্ন জোতদার পরিবার পরিবারে। তারপরও তখন গ্রামে প্রাণ ছিল, প্রাণচাঞ্চল্য ছিল।

আজ সেই গ্রাম নেই, সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। গ্রাম এখন অনেক উন্নত। পাকা রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুত ঘরে ঘরে, সব বাড়িতে স্যানেটারি ল্যাট্রিন হয়েছে, জমি চাষ হয় ট্রাক্টর দিয়ে, জমিতে পানি সেচের জন্য পাম্পকল আছে। গ্রামের সেই প্যাক কাদামাখা রাস্তার ওপর দিয়ে এখন হর্ন বাজিয়ে তরতর করে গাড়ি চলে, অটোরিক্সা চলে। এখন ছেলেমেয়েরা জিন্স, কেডস পরে স্কুলে যায়। সেই প্রাণচাঞ্চল্য কোথায় চলে গেছে কে জানে। এখন মানুষ বিত্ত-বৈভবের পেছনে বেশি দৌড়াচ্ছে।

ফেলে আসা সেইসব দিনের স্মৃতি এখনও টানে। কত মধুর স্মৃতি। আমার দাদি বনেদি বাড়ির মেয়ে। দাদির বাপের বাড়ির মানুষ যেমন ফর্সা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সুন্দর, তেমনি আমাদের বাড়ির মানুষ আগে থেকেই ফর্সা সুন্দর। একটা আভিজাত্য আমাদের কালেও লক্ষ্য করেছি দুই পরিবারে। তবুও নিজের কাজ নিজেরাই করতেন। গরু পালতেন বলদ দিয়ে হাল দিতেন, গাই পালতেন দুধের জন্য। বলা যায় আমাদের তেল লবণ গরম মসলা আর ইলিশ মাছ ছাড়া কিছুই কিনতে হতো না। বাড়িতে মুরগি পালতেন। যে ডিম মাংস হতো তাতে আমাদের চলে যেত।

পাঠক ক্ষমা করবেন। ধান ভানতে একটু নিজের গীত গেয়ে নিলাম।

বলছিলাম গ্রামীণ জীবনের কথা। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধের প্রথম দিকের কথা। তখন বর্ষা লাগলে দাদি বলতেন ডাওর লাগছে। মা-চাচিদের বলতেন ডালে-চালে খিচুড়ি রান্না করতে। নরম খিচুড়ি, ঢাকায় এসে যা ভুনা খিচুড়ি হয়েছে। শর্ষের তেল দিয়ে রান্না হতো। শুকনা মরিচ তেলে ভেজে পোড়ার মতো করে খিচুড়িতে দিতেন। আমরা খিচুড়ি খেতাম ইলিশ ভাজা দিয়ে। তখন জেলেরা নৌকায় বরফের টুকরোর মধ্যে ইলিশ মাছ নিয়ে ভোরে গ্রামে গ্রামে ইলিশ ইলিশ বলে হাঁক-ডাক দিত। আমার দাদি ৫ কেজির দুই ফুরা (বেতের ভান্ডা) চাল দিয়ে এক হালি ইলিশ মাছ রাখতেন। ওজন করলে একেকটি দেড় কেজি হবে। অর্থাৎ একটা ইলিশের দাম পড়ে ৩০/৩৫ পয়সা। তখন মাঠে খালে বিলে প্রচুর দেশী প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। পদ্মায় ইলিশ পড়ত প্রচুর। চাঁদপুরের মোলহেডের ডানে-বাঁয়ে দুই কিলোমিটার পদ্মায় শত শত ইলিশের নৌকা থাকত। এখন অবশ্য মোলহেডের সামনে ইলিশের নৌকা দেখা যায় না। এখন ব্যবসায়ীরা ভোলা, পটুয়াখালী এবং সাগরের ইলিশ চাঁদপুরে এনে পদ্মার ইলিশ বলে চালিয়ে দেয়। তবে চাঁদপুরের মোলহেডের দক্ষিণে হাইমচর চরভৈরবী পর্যন্ত মেঘনায় কিছু ইলিশ পাওয়া যায়। সেগুলো তত বড় না হলেও (৮০০-১০০০ গ্রাম) এখনও যথেষ্ট স্বাদের। বর্ষায় বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণ আর আশ্বিন-কার্তিকে কোন কোন বছর একটানা ৭/৮/১০ দিন পর্যন্ত বৃষ্টি থাকত। তখন একদিকে মন রোমান্টিক হয়ে উঠত- ‘আষাঢ়-শ্রাবণ মানে না তো মন। ঝরো ঝরো ঝরছে। তোমাকে আমার মনে পড়ছে’। এমনি সব গান রচিত হয়েছে। ঠিক তেমনি খিচুড়ি খাবার ধুম পড়ে যেত। অবশ্যই সম্পন্ন পরিবারে। গরিব পরিবারেও তেল নয়, মসলাপাতি নয়, পোড়া মরিচ নয়, শুধু ডালে, চালে খিচুড়ি হতো লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে।

আমাদের বাড়িতে যেদিন খিচুড়ি হতো আমরা ভাইবোন কাজিনরা কেউ কড়কড়া ভাজা ইলিশ দুই টুকরা, কেউ ডিম ভাজি দিয়ে খেতে পছন্দ করতাম। এখনও মনে হলে মন উড়ে চলে যায় গ্রামের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। এ এক রোমান্টিক নস্টালজিয়া। খিচুড়ি ইলিশ ভাজার কথা মনে পড়লে এখনও জিব্বায় পানি আসে। ঢাকায়ও ইলিশ ভাজা দিয়ে লেতরা খিচুড়ি খাই মাঝে-মধ্যে, তবে তাতে জিব্বায় পানি আসে না। খাওয়ার পর জিব্বা শুকিয়ে যায়। এই সবকিছুর পেছনে রয়েছে উৎপাদনে নানা ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার, কীটনাশক ব্যবহার। এর বিকল্প নেই অর্থাৎ হাইব্রিড ছাড়া আজ কোন দেশ সার্ভাইভ করবে না। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে বেশ কয়েকমাস পূর্ব জার্মানির বার্লিনে ছিলাম। জার্নালিজমের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমা ডিগ্রীর জন্য। সেখানকার জার্নালিস্টিক ইনস্টিটিউটের ডরমিটরিতে থাকতাম। নিচে ক্যান্টিন ছিল। প্রথম দিন ক্যান্টিনে গিয়ে দেখলাম প্রায় এক ফুট লম্বা সাগর কলা, গায়ে একটা দাগও নেই, হলুদ রঙের। আমি ৪টা নিয়ে আমার রুমে এলাম। একটা ছিলে মুখে দিলে মুখ বাঁকা হয়ে গেল, এতটুকু টেস্ট নেই। কলা খাচ্ছি না কি খাচ্ছি। ওদের ওখানে যে চালের ভাত খায় তাও একই রকম চাবাচাবা। এজন্যই বলছি জার্মানির মতো উন্নত দেশেও হাইব্রিড ছাড়া উপায় নেই। তবে সম্মানিত পাঠক বন্ধুরা রাজনীতিতে এই হাইব্রিড ভীষণ ক্ষতিকর তা মনে রাখতে হবে।

রাজনীতিতে খিচুড়ি

সরকারের মিডডে মিল নিয়ে রাজনীতিতে খিচুড়ি পাকানো হচ্ছে। গত কয়েকদিন সংবাদপত্র, ফেসবুক, অনলাইন মিডিয়াসহ বেশ লেখালেখি হচ্ছে। মিডডে মিল নতুন কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো শিশু ও শিক্ষাবান্ধব। অনেক আগে থেকেই এই মিডডে মিল চালু ছিল। এতদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মধ্যে মিডডেতে বিস্কুট দেয়া হতো। এখন সরকার পর্যায়ক্রমে সকল স্কুলের মিডডেতে খিচুড়ি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ বাচ্চাদের মধ্যে প্রোটিনযুক্ত হাইজেনিক খাবার হিসেবে খিচুড়ি পরিবেশন করবে এবং তা স্কুল কম্পাউন্ডেই বা কাছাকাছি স্থানে রান্না হবে। এই খিচুড়ি নিয়ে মিডিয়ায় দেখলাম খিচুড়ি পাকানো শুরু হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৬৬ হাজারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। একেক স্কুলে ৫ জন করে হলেও ৬৬০০০ x৫=৩,৩০,০০০ শিক্ষক রয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এক কোটি ৪০ হাজারের মধ্যে উন্নতমানের খিচুড়ি মিডডে মিল হিসেবে সরবরাহ করা হবে। বিশাল কর্মযজ্ঞ। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশাল কর্মযজ্ঞ যত বিশাল এবং কঠিনই হোক তিনি তার ধীশক্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং সাহস দিয়ে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। এক্ষেত্রেও সফল হবেন। কিন্তু এ নিয়ে শুরু হয়েছে খিচুড়ি পাকানো। মিডিয়ায় এসেছে এই খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য ৫০০ কর্মকর্তাকে বিদেশে (ভারতের কেরালায় সম্ভবত) প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে খরচ হিসেবে কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে (প্রথম আলো ১৮/৯/২০২০)। এমনি খবর দৈনিক জনকণ্ঠেও ছাপা হয়েছে। জনকণ্ঠে গতকাল প্রথম সম্পাদকীয়ও ছাপা হয়েছে।

আমি প্রথমে ছেলেবেলায় খিচুড়ি খাবার গল্প বলেছি। এর পেছনে আমার বক্তব্য হলো এখনও গ্রামের মহিলাদের খিচুড়ি রান্না করার জন্য প্রশিক্ষণের যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি অমুক বেগম তমুক বেগমের (নাম মনে করতে পারছি না) মোটা মোটা রান্নার বই পড়ারও দরকার নেই। তাই প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশের বাড়ির অভিজ্ঞ মহিলাদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে রান্না করার জন্য। আর ম্যানেজমেন্টে শিক্ষকদের ইনভলভ না করিয়ে এলাকার একজন শিক্ষিত যুবককে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। সে সহজেই ম্যানেজ করতে পারবে। সেইসঙ্গে ৫ কিংবা ১০ স্কুল নিয়ে একজন সুপারভাইজার নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।

অবশ্য এই প্রকল্প এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। তবু আলোচনা চলছে প্রতিদিন।

ক্স প্রাথমিক শিক্ষা ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেছেন এটা নিয়ে হৈচৈ করার কিছু নেই। যে কোন কাজেই অভিজ্ঞতা দরকার এবং তিনি নিজেও ভারতের কেরালায় গিয়ে দেখে এসেছেন বলে সাংবাদিকদের বলেছেন। পত্রিকায় বা মিডিয়ায় যেসব সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল নেই। যারা এ ধরনের বানোয়াট খবর প্রকাশ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। (জনকণ্ঠ, ১৮/৯/২০২০)।

– প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন খিচুড়ি রান্না শিখতে নয়, ম্যানেজমেন্ট দেখার জন্য লোক পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে তা এখনও অনুমোদন হয়নি।

বিশেষজ্ঞ মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যারা প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন তারা শিক্ষক না মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী? যেই হোন তাদের চাকরি বদলিযোগ্য এবং বিশেষ করে শিক্ষকদের পাঠালে পাঠদান ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা ভেবে দেখতে হবে।

একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার একটি ছোট্ট খবরের শিরোনাম- ‘কাশ্মীরে ৫০ হাজার মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু’। ভারতের বর্তমান নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারত অধ্যুষিত জম্মু কাশ্মীরকে দ্রুত হিন্দুত্ববাদী বানানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রদেশটিতে প্রায় ৫০ হাজার মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এতে জরাজীর্ণ মন্দিরসমূহ পুনর্নির্মাণের নামে ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মাজারগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠত না যদি আমাদের সামনে বাবরি মসজিদের অভিজ্ঞতা না থাকত। সামনে ভারতের নির্বাচন। হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র বানানোর পদক্ষেপ নিয়ে কতখানি সাফল্য ঘরে উঠবে তা দেখার বিষয়। তবে এটা ঠিক, এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর কিছুটা হলেও প্রভাব পড়তে পারে।

 

লেখক : মুহম্মদ শফিকুর রহমান

এমপি এবং সিনিয়র সাংবাদিক,

সাবেক সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

[email protected]

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০