আজ বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৩১ পূর্বাহ্ন


শিখনে মূল্যায়নের গুরুত্ব এবং আধুনিকতা ও গুণগতমান (পর্ব০১)

যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষার্থী ও তার শিখন।প্রত্যেক শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শ্রেণিকক্ষে পরিচালিত শিখন শেখানো কার্যাবলিতে শিক্ষার্থীরা কি শিখছে,কি মাত্রায় শিখছে,কতটা ভালোভাবে শিখতে পারছে অথবা তার শিখনে কি ঘাটতি রয়েছে এবং কতটা ঘাটতি রয়েছে সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া আর মূল্যায়নের মাধ্যমেই শিক্ষক শিক্ষার্থীর শিখন সম্পর্কিত এসব তথ্য সহজেই জানতে পারেন।শিক্ষার্থীর প্রয়োজন, চাহিদা অনুধাবন করে সেই অনুযায়ী শিক্ষক সহায়তা করতে পারেন।শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত শিখনশেখানো প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীর শিখনের উপর বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে অত্যন্ত জোরালো প্রভাব রয়েছে।একটি ভালো বা কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর শিখনমান উন্নয়নে সহায়তা করে৷
বিপরীতক্রমে দূর্বল মূল্যায়ন ব্যবস্থা মানসম্মত শিখনের পথে অন্তরায়।দূর্বল মূল্যায়ন সম্পর্কে শিক্ষাবিদরা বলেন,”বাংলাদেশের মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে বরাবরই বির্তক রয়েছে,সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বির্তকের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।দেশে যে মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে তার মূল্য রয়েছে”।এই মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ পায়।কিন্তু গুণগত মানের দিক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান,দক্ষতা,দৃষ্টিভঙ্গি, মানবিক ও নৈতিক গুণাবলি, মূল্যবোধ,শারীরিক শিক্ষা দেশপ্রেম,বিজ্ঞানমনস্কতা পরিমাপে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থা কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যে জ্ঞান,দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করার কথা অথবা যে গভীরতায় শেখার কথা তা তারা অর্জন করতে, বা শিখতে পারছে না।কেন পারছে না তা নিয়ে সরকার,শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ সবাই ভাবছেন।।কাজের কাজ খুব একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না।এর অন্যতম প্রধান কারণ যুগের চাহিদার সাথে সাথে মূল্যায়ন ব্যবস্থা সেভাবে আধুনিকায়ন করা হয় নি।দক্ষ,উচ্চশিক্ষিত ও মানসম্মত শিক্ষকের যেমন অভাব রয়েছে তেমনি অভাব রয়েছে সুষ্ঠু মূল্যায়ন ব্যবস্থা, গবেষণা, অনুশীলন, পরীবিক্ষণ (মনিটরিং) ও জবাবদিহিতার। শিখন মূল্যায়ন হলো একটি প্রক্রিয় যেখানে শিক্ষার্থীর শিখন কতটুকু হয়েছে তা জানা যায়।যথাযথ মূল্যায়নের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা আবশ্যক।। পরিকল্পনা পর্যায়ের মূল কাজ হল শিখনফল চিহ্নিত করে উপযুক্ত টুলস(অভীক্ষা) প্রণয়ন ও পরিচালনার ব্যবস্থা করা।শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীকে তার শিখনে সহযোগিতা করা এবং সেইসাথে শিক্ষকের শিখন শিখানো প্রক্রিয়ার মানোন্নয়ন করা অথচ আমাদের দেশের মূল্যায়ন ব্যবস্থা যা করার কথা তা করতে পারছে না কারণ শিক্ষাক্রমের যে শিখনফল তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন হচ্ছে না।উদাহরণস্বরুপ বলা যায়,আমাদের দেশে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ভাষা দক্ষতার চারটি (শোনা,বলা,পড়া,লেখা) মধ্যে দুইটি দক্ষতার পড়া ও লেখা মূল্যায়িত হচ্ছে কিন্তু শোনা, বলার দক্ষতা মূল্যায়নের উপর জোর কম দেওয়া হয়।যার ফলে উচ্চশিক্ষিত মাস্টার্স ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের বেশি ভাগেই ইংরেজিতে কথা বলতে গেলে তোতলামি শুরু করে দেয়।পড়া ও লেখার মূল্যায়ন এখন সৃজনশীল হওয়ার কারণে মুখস্ত নির্ভর পড়াশোনা অনেকাংশে কমে গেছে তবে মূল্যায়নের দূর্বলতার কারণে ডাবল এপ্লাস পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী ঢাবির মত নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে ফেল করে যা সবাইকে হতাশই করে না বরং চিন্তিত করে দেয় যে,এইসব শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষায় কিভাবে ইংরেজি বিষয়ে এপ্লাস পায়।তাই,শ্রেণিকক্ষের ভিতরে যদি শিক্ষার্থীর পঠনপাঠান,receiving(গ্রহণ), attending (মনোযোগ), understanding (অনুধাবন), remembering ( মনেরাখা),responding (সাড়াপ্রদান),vocabulary(শব্দ ভান্ডার),reading frequency (পঠন সাবলীলতা) , accuracy(শুদ্ধ উচ্চারণ), reading speed (পঠন দ্রুততা),prosdy(সঠিক ছন্দ),word stress(শব্দে জোর),subject knowledge(বিষয় জ্ঞান) practical knowledge (ব্যবহারিক জ্ঞান),ধর্মীয় অনুশাসন চর্চা,নৈতিক গুণাবলি চর্চা,দেশপ্রেম ও শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশভঙ্গি,সংগীত, চারু ও কারুকলা সহ অন্যান্য শিখন আনুষ্ঠানিক ভাবে মূল্যায়ন করা না গেলেও অনানুষ্ঠানিক ভাবে মূল্যায়ন করা যায় যেমন ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ফলাবর্তন দিয়ে ঘাটতি শিখন পূরণ করে শ্রেণিকক্ষে শতভাগ শিখন নিশ্চিত করা যায়।ধারাবাহিক মূল্যায়ন শ্রেণিকক্ষে শিখনো কার্যাবলির অংশ হিসাবে অনুষ্ঠিত হয়।এই মূল্যায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক কোন বিজ্ঞপ্তি দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।শিশুশ্রেণি থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের উপর বইয়ের বোঝা,অভিভাবক ও গৃহশিক্ষক কর্তৃক শিশুদের উপর অতিরিক্ত চাপ,সহপাঠীদের সাথে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার পরির্বতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু করা হবে যা বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ।

এছাড়াও বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য হল,স্বাধীনতার পর জাতি এই প্রথম একটি আধুনিক,মানসম্মত ও সময়োপযোগী পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি ২০১০ পেয়েছে।পরীক্ষা আর পরীক্ষা দিয়ে অর্থাৎ প্রান্তিক মূল্যায়ন দিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। কারণ শিখন শিখানোর চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকেই যেন বড় করে দেখা হয়,এখানে শিক্ষার সব আয়োজন যেন পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই।কত শতাংশ পাশ করেছে,কতটা এ প্লাস এসবের গণনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ফলে জাতির ফোকাস এখন শ্রেণিকক্ষের শিখন শিখানো কার্যক্রমে নয় বরং পরীক্ষার কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর খাতায় ভিতর যারকারণে আজ অভিভাবকরা নিজের সন্তানের ভালো গ্রেড পাওয়ার উদ্দেশ্যে নকল সরবরাহ বা টাকা দিয়ে প্রশ্নপত্র কিনতে সামান্যতম লজ্জাবোধ করছে না।পরীক্ষা নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়ন নিয়ে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।এর ফলে পরীক্ষাভীতি,গৃহশিক্ষক, গাইডবই, কোচিং সেন্টার , শর্টকাট ম্যাথড,পরীক্ষা ভিত্তিক সাজেশন বুক এর প্রয়োজন হবে না বরং পাঠ্যপুস্তকই যথেষ্ট হবে। ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়ন মাঠ পযার্য়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত করার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে যেমনঃ

১।সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় সকল শিক্ষকদের সুপরিকল্পিতভাবে মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রাথমিক শিক্ষকগণ প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ গমন সুযোগ পাচ্ছে যা বর্তমান সরকারের আরেকটি সুন্দর উদ্যোগ। এছাড়াও ভালো শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষকগণ প্রতিবছর বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে,শিক্ষকগণ শিখনের প্রতি ও পেশার প্রতি পূর্বের চেয়ে বেশি মনোনিবেশ করছে।একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করলে একঘেয়েমি,কাজের প্রতি অনীহা ও আধিপত্য মনোভাব সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এছাড়াও পিছিয়ে পড়া বিদ্যায়লগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে জন্য অগ্রগামী বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের মধ্যে বদলি ব্যবস্থা চলমান রাখা উচিত।

২।শিক্ষকদের উপর শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে আনতে হবে।মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষকের বিকল্প কিছুই নেই।সেইজন্য মানসম্মত শিক্ষক সংখ্যা বাড়াতে হবে,ভালো শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হবে।চাকরির সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।আজ অনেকে এই মহৎ পেশা ছেড়ে অফিসের কেরানি হতে স্বপ্ন দেখে, অফিসার হতে চায়,জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এইরকম মনমানসিকতা দূর করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুব দরকার। সেই লক্ষ্যে, বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশি পদটি দ্বিতীয় শ্রেণি আর সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে উন্নতি করেছে যা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এইরকম আরও কিছু ভালো উদ্যোগ নিতে পারলে শিক্ষকতা পেশার প্রতি উচ্চশিক্ষিত শিক্ষার্থীদের আর্কষণ বাড়বে।এছাড়াও সামাজিক ও আর্থিক ভাবে শিক্ষকরা লাভবান হবে।শিক্ষকদের কাজের অগ্রগতির জন্য সর্বদা জবাবদিহিতা ও পরামর্শ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।দূর্বল জবাবদিহিতা শিখন শিখানো কার্যাবলির অগ্রগতি কে বাধাগ্রস্ত করে।

৩।শিক্ষাব্যবস্থা কে পরীক্ষাভিত্তিক বা সার্টিফিকেট ভিত্তিক না করে শিখনফল শতভাগ অর্জনে শ্রেণিকক্ষে শিখন-শিখানো প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে হবে।

৪।শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের চালিকাশক্তি তাই তাদেরকে আরও আন্তরিক, পেশাদারিত্ব মনোভাব, রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত,দলাদলিমুক্ত,পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সময়ানুবর্তিতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ কর‍তে হবে।প্রবাসীভাইয়েরা রাতদিন অমানবিক পরিশ্রম করে মহাদুর্যোগের মধ্যেও আমাদের দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করে যাচ্ছে অথচ সেই কষ্টার্জিত অর্থ দক্ষ ও যোগ্য মানবশক্তির অভাবে প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে । সুতরাং, ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বের বুকে উচু হয়ে দাঁড়াতে হলে দক্ষ মানবশক্তির বিকল্প কিছুই নাই। তাই, পরীক্ষা নির্ভর মূল্যায়ন করে বস্তা বস্তা সস্তা সার্টিফিকেট ফ্যাক্টরি জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিত না করে বরং দক্ষ জনশক্তি ও বেকারমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গঠন করার উদ্দেশ্যে শ্রেণিকক্ষে শতভাগ শিখনফল অর্জনের লক্ষ্যে আধুনিক, যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়ন সফলভাবে বাস্তবায়ন করতেই হবে।

লেখক-
মোঃ আশরাফুল আলম,
সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার
গোয়াইনঘাট, সিলেট।