আজ বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৪২ পূর্বাহ্ন


বেপরোয়া তোফা চেয়ারম্যানের ভয়ে আতঙ্কে এলাকাবাসী

নিরাপত্তার জন্য রাতে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে ঘুমায় মানুষ

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি:
আগামী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে সামনে রেখে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হুগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন খান তোফা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার কথা মতো না চলে মারধর ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে জন সাধারনকে। প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। চেয়ারম্যানের প্রভাব খাটিয়ে তিনি ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব করছে। তার কথার অবাধ্য হলেও যুবক থেকে বৃদ্ধ, ধনী থেকে গরীব কেউ রেহাই পায় না। তার বিরুদ্ধে গেলে মারধর থেকে শুরু করে মিথ্যা মামলা দিয়েও হয়রানি করেন তিনি। তাই তোফার হাত থেকে বাচতে চায় ইউনিয়নের জন সাধারণ। ইতি মধ্যে মারধর, মানহানির কারনে চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন খান তোফার বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক তিন মামলা হয়েছে।
সরেজমিন ওই ইউনিয়নে গেলে মারধর ও মিথ্যা মামলার দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ জনসাধারণ। এমনকি তার কথার অবাধ্য হওয়ায় এক ইউপি সদস্যকে সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখেছেন তিনি। এছাড়াও এক গ্রাম পুলিশকে ডিউটি থেকেও বিরত রাখছেন চেয়াম্যান।
সদর উপজেলার চর হুগড়া গ্রামের বাসিন্দা হিরু চাকলাদার কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে সিরাজগঞ্জে চাকুরী করে। আমি ও স্ত্রী দুজনের বাড়িতেই থাকি। কৃষি কাজ করে কোন রকম সংসার চালাই। তবে চেয়ারম্যান তোফার অতিষ্টে শান্তিতে বসবাস করতে পারিনা। চেয়ারম্যান ও তার লোকজনের ভয়ে রাতে ঘরের বাইরে তালা দিয়ে ভিতরে ঘুমাই। সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে বাড়ি থেকে দৌড়ে পালাই। তিনি আরো বলেন, হুগড়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন খান তোফার সাথে সাবেক চেয়ারম্যান মোর্শেদ আলম দুলালের রাজনৈতিক দ্বন্দ রয়েছে। কিন্তু তার প্রতিহিংসা হিসেবে তোফা চেয়ারম্যান আমাদের সাথে খুব খারাপ আচরণ করেন। আমরা সমাজে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।
শুধু হিরু চাকলাদার নয়, হিরু চালকদারের মতো হুগড়া ইউনিয়নের অনেকেই তোফার ভয়ে আতঙ্কে রাতদিন পার করছে। গত ৪ নভেম্বর চর হুগড়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম পাশ্ববর্তী বেগুনটাল বাজারে ধানের বীজ ও কাপড় কিনতে গেলে তোফা তার লোকজন তাকে (সাইফুলকে) তুলে নিয়ে তার ক্লাবে বেধরক মারধর করে। এ ঘটনায় সাইফুলের পা ভেঙ্গে যায়। কয়েক দিন চিকিৎসার পর তিনি গত ৯ নভেম্বর আদালতে মামলা দায়ের করেন। এর আগে তোফা চেয়ারম্যানের উপর হামলার অভিযোগে চেয়ারম্যান বাদি হয়ে সাইফুলের নামে সদর থানায় দায়ের করেন।
চর হুগড়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তোফার কথা মতো না চলায় তার সাথে আমার বিরোধ সৃষ্টি হয়। যে কারনে তিনি লোকজন নিয়ে আমাকে প্রায় চার ঘন্টা ক্লাবে আটকিয়ে বেধরক মারধর করে আমার ডান পা ভেঙ্গে দেয়। এ বিষয়ে মামলা দায়ের করলে মামলা তুলে নিতে হুমকি প্রদান করছে। আমি এর বিচার দাবি করছি।’
সাইফুলের মেয়ে মমতা বেগম বলেন, ‘আমার বাবার অবস্থা ভাল নয়। মাঝে মধ্যে সম্পূর্ণ শরীর ফুলে উঠে। তোফা চেয়ারম্যান আমার বাবাকে বেধরক মারধর করেছে। আমরা তোফা চেয়ারম্যানের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবি করছি।’
সাইফুলের ভাই রজব আলী বলেন, ‘চেয়ারম্যানের কথা মতো না চলায় আমার ভাইকে ক্লাবে ধরে নিয়ে কাঠের লাঠি, রড দিয়ে বেধরক মারধর করছে চেয়ারম্যান ও তার অনুসারিরা। রাতে আমাদের এলাকায় এসে ফাঁকা গুলি করে। ধরে নিয়ে মারধর ও মিথ্যা মামলা দেওয়ার হুমকি দেয়। আমরা একটু শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন আসে, নির্বাচন চলে যায়। কিন্তু আমাদের সাথে চেয়ারম্যান তোফার শত্রুতা রয়ে যায়। চেয়ারম্যান নিজে ও তার লোকজন দিয়ে আমাদের খুব হয়রানি করেন।’
বেগুনটাল গ্রামের হায়দার আলী নামের এক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘তোফার বাহিনী যা শুরু করেছে। তাতে এলাকায় কোনদিন শান্তি ফিরে আসবে না । প্রতিবাদ করলে মারধর করতে আসে। আমরা এলাকায় নির্ভয়ে বাঁচতে চাই।’
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘৬০ বছর ধরে আমরা ৭২ শতাংশ জমি ভোগ দখল করছি। কাগজ পত্র সবই আমাদের নামে। কিন্তু চেয়ারম্যানের কথা মতো না চলায় চেয়ারম্যান তার অনুসারি ফজল নামে একজনকে আমাদের জমি দখল করতে পায়তারা করতেছে। আমরা চেয়ারম্যানের শাস্তি দাবি করছি।’
মঞ্জিলা বেগম নামের এক গৃহবধু বলেন, ‘আমি একটি চাঁদাবাজির মামলায় কয়েকজন আসামীকে জেল খাটিয়েছি। কিন্তু আসামীরা চেয়ারম্যানের লোক হওয়ায় চেয়ারম্যান মামলা তুলতে হুমকি দিচ্ছে। মামলা না তুলে নিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দিচ্ছেন তিনি।’
হুগড়া ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য আইয়ুব আলী বলেন, ‘১৯৯৯ সালে তোফা চেয়ারম্যান আমার একটি পা কেটে ফেলেছে। মামলা করলে আমাদের পরিবারের সদস্যদের জিম্বি করে মামলা তুলে নেওয়া হয়। এর পর প্রায় দেড় বছর আগে আমাকে প্রাণে মারার জন্য তারা ভাড়া করা গুন্ডাবাহিনী দিয়ে হামলা করায়। ইউপি সদস্য হওয়ার পরে গত চার বছরে আমাকে কোন অনুদান দেয়নি। আমার ওয়ার্ডে সে তার ইচ্ছে মতো লোকজনদের সহযোগিতা করেন। তবে আমাকে সে বিষয়ে অবগত করেন না। আমি শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
হুগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন খান তোফা বলেন, ‘ইউপি সদস্যে পা কাটার বিষয়টি ২০ বছর আগের। তার পর আপোষ করা হয়েছে। একটি মহল রাজনীতিক প্রতিহিংসায় আমার নামে কুৎসা রটাচ্ছে।’